বাংলাদেশের মণিপুরি কবিতা ॥ হাফিজ রশিদ খান

Untitled-7-1মণিপুরি ভাষায় ‘ওগ্রি হাংগেল’ আর বাংলায় গীতিকবিতা একই অর্থময়তার দ্যোতক। পৃথিবীর আদি মানবগোষ্ঠীগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্যের মতো মণিপুরিদের কাছেও গীতিকবিতা ছিল হৃদয় ও চেতনাবৃত্তি প্রকাশের প্রাথমিক বাহন। মণিপুরি রাজারা সিংহাসনে আরোহণের সময় ওগ্রি হাংগেল পরিবেশনের মাধ্যমে সূর্যের পুজো দিতেন। সূর্য ছিল তাদের আরাধ্য দেবতা। রাজপুরুষরা চাইতেন সূর্যের মতোই চিরসমুজ্জ্বল আর প্রভাময় থাকতে। ‘ওগ্রি হাংগেল’ লিখিত নয়, মুখে-মুখে রচিত সাহিত্য। কথা ও সুরের মায়াজালে মণিপুরি লোকায়ত সমাজে এখনো এর জের আছে।
বাংলাদেশে মণিপুরিরা বসতি স্থাপন করে প্রায় ২০০ বছর আগে। ১৮১৯-১৮২৬ সাল পর্যন্ত স্থায়ী মণিপুর-বার্মা যুদ্ধের সময় বর্মীদের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়ে মণিপুরিদের একটা অংশ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথানত সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জে এদের বসবাস রয়েছে।

বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণের আগে মণিপুরিদের সাধারণ পরিচিতি ছিল ‘মেইতেই’ এবং আদিভূমির (বর্তমান ভারতের মণিপুর রাজ্য) নাম ছিল ‘মেইতেই লেইপাক’। আঠারো শতকে মণিপুররাজ পামহৈবার (দরিদ্র দরদি বলে যার আরেক নাম গরিবে নেওয়াজ) সময় মহাভারতের একটি কাহিনীর সূত্রে এর নতুন নাম হয় ‘মণিপুর’ আর আদিবাসীরা ‘মণিপুরি’।

গত শতাব্দীর সত্তর দশকের মধ্যপর্বে বাংলাদেশে মণিপুরি সাহিত্যের চর্চা শুরু। দীপান্বিতা, মৈরা, সজিবু, ইপোম, ওগ্রি প্রভৃতি সাহিত্যপত্র ও ছোট কাগজের প্রকাশনায় এ চর্চার ধারা এখন অনেক বেগবান, সংহত। মণিপুরি তরুণদের অনেকেই মাতৃভাষার পাশাপাশি বাংলায়ও সাহিত্যচর্চা করছেন। এখানে কয়েকজন মণিপুরি কবির কবিতা পত্রস্থ করা হলো।

অন্ধকার ॥ এ কে শেরাম

অন্ধকারে ভয় খুব –
হৃদয়হীন জল্লাদ ও প্রেতাত্মাকেও অতো নয়;
দৃষ্টিভঙ্গির পেঁচানো অন্ধকার
কৌশলের অন্ধকার
চেতনা ও মননের অন্ধকার-

সহজ চলাচলেও ব্যাপ্ত হয়ে আছে আজ !

এ মিলিত তিমির ঘনীভূতরূপে
ভয়ানক বিভীষিকা আনে চারপাশে;
তুচ্ছ কচুরিপানাও এই অন্ধকারে
ফোস করে-ওঠা যেনো ভীতির দেবতা : ‘লাই’ !

আত্মপ্রতিকৃতি ॥ শেরাম নিরঞ্জন

নতুন-নতুন পথে ছুটছে আমার
চেতনার দুর্বার স্কুটার-
আর বাস্তবে মানুষ আমি এক গ্লানিময়
নত হয়ে
চলি ভয়ার্ত, বিবশ !

পৃথিবীটা পূতিগন্ধময়-
চিনেছি ভালোই ঘৃণিত সমাজ
এই হৃদয়হীন স্বজনদেরও;

আর নিজের বলয়ে
ওতপ্রোতভাবে জড়িত এ আমাকে তো
চিনেছি সকলের আগেই !

তুমি ॥ সনাতন হামোম

তুমি সুন্দর ঝরিনি তাই বৃষ্টি হয়ে
ঝড়ো বাতাসের মতো বইনি তোমার পাশ ঘেঁষে
পুজোর সময় তোমার হাতের আলোকিত বর্তিকায়
নাচের বিনম্র তালে
টেনেছ ভাটির স্রোতের মতন-
পাশে বৃষ্টিভেজা কাকের দুর্দশা দেখে
মন কেঁদেছিল, তবু
চাহনির মর্তবা বুঝবো বলে ফিরেও চাইনি
ওই বেচারার দিকে;

রাসপূর্ণিমার মেলায় অমন অভিমানী চোখ
হলুদাভ ফনেকে আবৃত অধোদেশ
উৎকন্ঠিত এলোচুল
গলায় সোনার হার-

অজান্তে দিয়েছে কন্ঠে বুনোস্বভাবের এই গান !

জোনাক চোখের ভোর ॥ কন্থৌজম সুরঞ্জিত

দাদিমার
স্মৃতিগল্পের ভেতর আঁকাবাঁকা পথে
ধীরে-ধীরে প্রসারিত
এই সব খুব দরদিয়া অক্টোপাস;

সময়ের বেপোয়ারা গতি
যখন গোগ্রাসে খেয়ে নিচ্ছে ওদের শরীর নিরাই-নিভৃতে,
জোনাকের নম্র আলো সান্ত্বনার বকুল ঝরানো সম্ভাষণ আনে
সে-সময়
আরও একটু সটান হয়ে
ঘুমোবার চেষ্টা করতেই
কে আমাকে জাগায় রাতের রিকশায়
ঝুলে থাকা
অতন্দ্র হারিকেনের মতো!

ভোরের প্রভায় তা তা থৈ থৈ করা
লতায় জড়ানো কুঁড়িটির মতো
ওড়িশি নৃত্যরত রাত-

চোখে যার সকালের মলিন কাজল!
বাজার দেবী বাজার দেবী ॥ থোঙাম সনজয়

যুদ্ধে-যুদ্ধে ভরা এ জীবনে অবশেষে জানলাম :
অবিশ্বাসের এ ঘোর লড়াইয়ে তুমিও আমার শত্রু-
বুকের বাঁ-পাশে মনে হয়
পেণ্ডুলামের মতোই দুলছে বেদনা;

এভাবে বাঁচবো কতদিন খাঁচাবন্দি পশুর সমান !

তপ্ত কড়াইয়ে খৈ-এর আর কীবা পরিণতি
জ্বলন্ত চুলোয় কিছুক্ষণ লাল হওয়া ছাড়া?

যখন সে কিনেছে আমাকে- করেছে মুক্তির পথও রুদ্ধ
তখন কী আর করণীয়
বাজার দেবীর নিজস্ব গোলাম হয়ে যাওয়া ছাড়া!

কুকুর ॥ পারী চিংথাম

আজকের দিনটা দেখছি খুব বেদনামথিত
কেমন নির্বাক হয়ে গেছি, অন্ধ হয়ে যাচ্ছি..

তবু চিটে-যাওয়া স্বপ্ননারীর কাহিনী
দেখতে পাচ্ছি এ দীর্ঘশ্বাসেও !

কথা দিয়েছি যদিও গতকালই শেষ
তবু আজকেও আবার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে;

ভাবি : চোখটাকে তুষ্ট করি একবার
পরক্ষণে নিবৃত্তির কঠিন জ্বলুনি দিয়ে
নেড়েছি ওদের…

এখন আমার আর ফাঁস ছাড়া গতি নেই কোনো..
[হাফিজ রশিদ খান : আশির দশকের অন্যতম কবি। তাঁর অনেক গ্রন্থের মধ্যে একটি সম্পাদিত গ্রন্থ হচ্ছে ‘অরণ্যের সুবাসিত ফুল : আদিবাসী কবিতার নির্বাচিত সংকলন’।

এখানে তিনি বিভিন্ন আদিবাসী কবির কবিতা সংকলন করেছেন। এটি তাঁর একটি উল্লেখযোগ্যকর্ম।]

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
Send this to a friend